Skip to main content

নবজাতক ও শিশুর ওরাল থ্রাশ: সচেতনতাই রক্ষাকবচ

 “খোকার ঠোঁটে যে হাসিখানি

চমকে ঘুমঘোরে

কোন্ দেশে যে জনম তার

কে কবে তাহা মোরে।”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার মতই শিশু রাজ্যের প্রতিটি শিশুর হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখ নিতান্তই কাম্য। কিন্তু মাতৃ-পিতৃ হৃদয়ে অত্যন্ত পীড়াদায়ক কিছু ঘটে যখন নিষ্পাপ শিশুর সেই উজ্জ্বল হাসি মলিনতার মাঝে মিশে যায়। জীবাণু বিস্তৃত পৃথিবীতে শিশু হয়ে পড়ে অত্যন্ত অসহায়। পিতা-মাতার চোখের পাতা থেকে সুখ-নিদ্রা দুশ্চিন্তার অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অথচ সামান্য সচেতনতাই হতে পারে শিশুর হাসি কেড়ে নেয়া এই ওরাল থ্রাশ নামক রোগের উল্লেখযোগ্য সমাধান।

ছত্রাক দ্বারা সংঘটিত হয় মুখের এই রোগ। সাধারণত ক্যানডিডা আলবিক্যান্স নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে ওরাল থ্রাশ হয়। ওরাল থ্রাশ সচরাচর অক্ষতিকর ও ক্ষণস্থায়ী ছত্রাকঘটিত মুখবিবরের সংক্রমণ। এর সংক্রমণের ফলে মুখবিবরের জিহ্বা, ঠোঁট ও গালের অভ্যন্তরভাগ, তালু, আলজিহ্বা, টনসিল ও গলার ভিতরের অংশে ক্রিমের মত সাদা সাদা স্তুপ বা আস্তরণ জমা হয়। ক্রিমের মত স্তুপ বা আস্তরণ তুলে ফেলার পর লালচে ক্ষত সৃষ্টি হয়, আবার কখনো কখনো রক্তপাতও হতে পারে। বয়স্কদের বেলায় জ¦ালাপোড়া ভাব হয়। তবে ওরাল থ্রাশ নবজাতক ও কম বয়সী (যারা মায়ের দুধ পান করছে এমন) শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ রোগ। ফিডার খাওয়া, অকালে ও স্বল্প ওজনে ভূমিষ্ঠ হওয়া, ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা শিশু এই রোগে বেশি ভোগে। বেশি বয়স্ক শিশুদের মধ্যে অপুষ্টিতে ভোগা, দরিদ্র, ডায়াবেটিস আক্রান্ত, ইনহেলার ব্যবহারকারী (অ্যাজমা রোগের ক্ষেত্রে), কেমোথেরাপি গ্রহণকারী ও নকল দাঁত ব্যবহারকারীরা-ই বেশি আক্রান্ত হয়। 




 


এই ছত্রাকের সংকক্রমণের কারণে মুখে ব্যথা অনুভূত হয়। স্বাদে পরিবর্তন দেখা যায়। গলার ভেতরে সংক্রমণের ফলে নবজাতকের পক্ষে স্তন পান করা কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং নবজাতকে এক প্রকার ভীতির সৃষ্টি হয়। নবজাতক স্তন পান করা থেকে বিরত থাকে। ক্ষুধায় মাত্রাতিরিক্ত চিৎকার করতে থাকে। দেহের ওজন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ সময় মুখে অন্যান্য ক্ষতিকারক জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। 


বিভিন্ন উপায়ে ক্যানডিডা আলবিক্যান্স শিশুর দেহে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। যেমনÑ

১. স্বাস্থ্যগতভাবে অপরিষ্কার জীবন পরিচালনাকারী মায়ের স্তনের মাধ্যমে শিশুর মুখে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটতে পারে। 

২. অপরিষ্কার ফিডার বা বোতলে দুধ পান করালে।

৩. ঘুমন্ত অবস্থায় স্তন পান বা ফিডার খাওয়ানো হলে।

৪. অপরিষ্কার জায়গায় শিশুকে খেলতে দেয়া হলে।

৫. অপরিষ্কার অবস্থায় সন্তান প্রসব করলে মায়ের দেহ থেকে অথবা অপরিষ্কার হাতের স্পর্শ থেকে ক্যানডিডা আলবিক্যান্স শিশুর দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। 

৬. ঘন ঘন অসচেতনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ শিশুকে খাওয়ানো হলে।

৭. স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দীর্ঘদিন যাবৎ খাওয়ানো হলে। 

৮. অধিক বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে নকল দাঁত নিয়মানুযায়ী ব্যবহার না করলে।


এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের পরিমিত পুষ্টির অভাবে স্বল্প ওজন ও অকালজাত শিশুর কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ওরাল থ্রাশের একটি  অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করা হয়। 

 

সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য কারণগুলো থেকে সহজেই অনুমেয় যে, ওরাল থ্রাশ থেকে দূরে থাকায় প্রয়োজন সচেনতা। সবচেয়ে বেশি পালনীয় সচেনতাগুলো হল:

১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবস্থায় নবজাতক ও শিশুকে দুধ পান করানো। ফিডার বা বোতল নিপলসহ গরম পানিতে দিয়ে পরিষ্কার করে নেয়া। ঘুমন্ত অবস্থায় দুধ পান না করানো। প্রতিরাতে বুকের দুধ খাওয়ানোর পর নরম সুতি কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে আঙ্গুলে পেঁচিয়ে নিয়ে নবজাতক ও শিশুর মুখবিবর ভালভাবে পরিষ্কার করে দেয়া অথবা শিশুকে কুলি করানো।

২. প্রসবকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

৩. স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক, ইনহেলার জাতীয় ওষুধ দেওয়ার পর নবজাতক বা শিশুর মুখ ভালভাবে পরিষ্কার করে দেয়া।

৪. শিশুর মুখে প্রথম দাঁত দেখা দেবার পর থেকে পরিমিত পরিমাণে টুথপেস্ট দিয়ে নিয়মিত দাঁত, জিহ্বা ও মাড়ি ব্রাশ করে দেয়া। 

৫. ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের নিয়মিত চেক-আপ করানো।


তথাপি, মুখে এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। সরকারের অন্যতম আবিষ্কার কমিউনিটি ক্লিনিক-এর কাছ থেকেও মিলতে পারে সহজে চিকিৎসা সেবা। অবস্থা খুব খারাপ হলে বিশেষজ্ঞ ওরাল সার্জনের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে, অবহেলার কারণে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে দেহের বিভিন্ন অংশে। 

Comments

Popular posts from this blog

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের পদক্ষেপ, অর্জন এবং গ্রামাঞ্চলে করণীয়

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মাতৃভূমি আজকের বাংলাদেশ বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নারীকে সম্পৃক্ত করে সমাজে পুরুষের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করাই হল নারীর ক্ষমতায়ন।

টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ

  বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসমতা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করা এবং শান্তি ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক জীবনে টেকসই ভবিষ্যত গঠনের লক্ষ্যে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত হয় টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি)। টেকসই ভবিষ্যত গঠনে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই এসডিজি বিশ্বব্যাপী  টেকসই ভবিষ্যত অর্জনের ব্লু প্রিন্ট নামে পরিচিত। যে ব্লুপ্রিন্ট বিশে^র দেশসমূহের কাছে মোট ১৭টি অভিষ্ট সমন্বিত একটি দলিল। ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে গৃহীত অভিষ্টগুলো অর্জনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। যা ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে কার্যকর হয়। অত্যন্ত গর্বের বিষয় হলো, মোট ১৭টি অভিষ্টের মধ্যে ১৫টি বাংলাদেশের সুপারিশকৃত প্রস্তাবের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। সঙ্গত কারণেই এসডিজি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এসডিজি’র সে গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষেত্র অনুযায়ী, দেশের এ পর্যন্ত অর্জনগুলো পর্যালোচনা করলে তা সহজেই প্রতিয়মান হয়। দেশে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দারিদ্র্যের...