Skip to main content

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের পদক্ষেপ, অর্জন এবং গ্রামাঞ্চলে করণীয়

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মাতৃভূমি আজকের বাংলাদেশ বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নারীকে সম্পৃক্ত করে সমাজে পুরুষের সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করাই হল নারীর ক্ষমতায়ন।

আর এ ক্ষমতায়নের শুরুটা রচিত হয়েছিল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের পর প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসনতন্ত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে। আর এই শাসনতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রুপায়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন-১৯৭২, মহিলা বিষয়ক সংস্থা-১৯৭৬, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়-১৯৮৪ (পরবর্তীতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়-১৯৯৪), জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদ-১৯৯৪ এবং বাংলাদেশ ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সিডোও সনদের ২, ১৩(ক), ১৬(ক), ১৬(চ) ধারাগুলি সংরক্ষণে রেখে অনুস্বাক্ষর করেছে (১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৩(ক), ১৬(চ) ধারা ২টি থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে)।

যেহেতু বর্তমান গতিশীল বিশ্বে সকল আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দেশের প্রায় ৮.১৭ কোটি (আদমশুমারী-২০১১) নারী জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত বাঙালি জাতির সার্বিক উন্নয়ন কল্পনামাত্র এবং নারীর সক্ষমতা যুগোপযুগী মানে উন্নীতকরণের বিকল্প নেই তাই প্রণয়ন করা হয়েছে নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১। এ নীতিমালার মাধ্যমে সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুত্তি, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও ঋণসহ সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে পূর্ণ অধিকারের নিশ্চয়তা। যার ফলে গত এক দশকে লিঙ্গ সমতা অর্জন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ, উন্নত মাতৃস্বাস্থ্য সেবা, নারী শিক্ষার হার, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, সরকারি চাকরিতে নারীর সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে এবং হ্রাস পেয়েছে নারী বেকারত্ব।

গত এক দশকে নারীর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা এবং অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ পর্যালোচনা করলে সহজেই বাংলাদেশে নারীর আর্থ-সামাজিক চিত্র ফুটে উঠে; যেমন- বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স-২০১৯ অনুযায়ী নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম স্থানে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে এ অবস্থান ছিল ৯৩তম অবস্থানে। বর্তমানে ৪০% নারী শ্রমবাজারে নিয়োজিত অথচ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ছিল ২৯% যে কারণে দেশের জিডিপিতে নারীদের অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪%। দেশে ১৩,৮৮১টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ১৩,০০০টি ম্যাটারনিটি সেন্টার এবং ৩০,০০০ টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করায় ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে মাতৃমৃত্যু হার কমে হয়েছে প্রতি লাখে ১৬৩ জন যা ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৩২০ জন। বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার হার ৭২% কিন্তু ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ছিল ৪৩.৭%। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নারীদের প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ছিল ৫৭% যা বর্তমানে ৯৯.৪০%। বর্তমানে সচিব, অতিরিক্তি সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারী চাকুরিতে প্রায় ২৭% নারী কর্মরত রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলÑ বর্তমান জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ মোট ৭৩ জন নারী দায়িত্ব পালন করে আসছেন যা বিশ্বে বিরল।

বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নের উল্লেখযোগ্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরুপ ড. কালাম মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৯, লাইফ টাইম কন্ট্রিবিউশন অ্যাওর্য়াড-২০১৯, গ্লোবাল ওমেন’স লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮, পিস ট্রি অ্যাওয়ার্ড-২০১৪ লাভ করেছে। এখন বিষয় হল, ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দেশের অধিকাংশ মানুষ যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং যাদের মধ্যে অর্ধেক নারী রয়েছে তারা কি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে ? বর্তমানে গৃহীত পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে গ্রাম্য নারীদের জন্য কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে?

Girls Standing Behind Woman Crushing Food

যেহেতু বর্তমান পৃথিবী আর আগামী দশ বছর পরের পৃথিবী এক হবে না সুতরাং এখনই নারীদের যুগোপযোগীভাবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে গ্রাম্য নারীদের অধিকাংশ আগামীতে প্রযুক্তির গতিশীল পৃথিবীর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের নারীরা জীবনমানে পিছিয়ে পড়বে। অপর দিকে যেহেতু সম্পদের বিরাট বৈষম্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে তাই নারীর ক্ষমতায়নের অর্জিত সাফল্য বিনষ্ট হওয়ারও সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে যেমন- গ্রামীণ এলাকায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ধারণার ব্যাপকমাত্রায় প্রসার ঘটানো, নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবার ব্যবস্থা করা, দেশীয় কুটির শিল্পের ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে এগুলোর পণ্য দেশে বাজারজাতকরনের পাশাপাশি অনলাইন ভিত্তিক বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে বৈদেশিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করণের ব্যবস্থা করা, গ্রামীণ পর্যায়ের নারীদের প্রাকৃতিক দক্ষতাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুলে আনা, কারিগরি পদ্ধতির শিক্ষার প্রসার ঘটানো, বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করে নারীদের উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের পথ সুগম করা, নারীদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উৎপাদনমুখী খাতে সম্পৃক্ত করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান দ্রুততম সময়ে চালু করা যাতে বাড়ির কাজের পাশাপাশি সহজে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়, গ্রামীণ পর্যায়ে অধিক সংখ্যক নারী উদ্যোগক্তা সৃষ্টি করা, গ্রামাঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা, জনগণের শহরমুখী প্রবণতা ঠেকাতে গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয় চাহিদা সহজপ্রাপ্য করা।

যেহেতু কোন দেশের সার্বিক উন্নয়ন নারী ব্যতীত শুধু পুরুষদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের সকল স্তরের নারীদের উন্নয়নের বিকল্প নেই তাহলেই আগামীতে অর্জিত হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন।

Comments

Popular posts from this blog

নবজাতক ও শিশুর ওরাল থ্রাশ: সচেতনতাই রক্ষাকবচ

 “খোকার ঠোঁটে যে হাসিখানি চমকে ঘুমঘোরে কোন্ দেশে যে জনম তার কে কবে তাহা মোরে।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার মতই শিশু রাজ্যের প্রতিটি শিশুর হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখ নিতান্তই কাম্য। কিন্তু মাতৃ-পিতৃ হৃদয়ে অত্যন্ত পীড়াদায়ক কিছু ঘটে যখন নিষ্পাপ শিশুর সেই উজ্জ্বল হাসি মলিনতার মাঝে মিশে যায়। জীবাণু বিস্তৃত পৃথিবীতে শিশু হয়ে পড়ে অত্যন্ত অসহায়। পিতা-মাতার চোখের পাতা থেকে সুখ-নিদ্রা দুশ্চিন্তার অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অথচ সামান্য সচেতনতাই হতে পারে শিশুর হাসি কেড়ে নেয়া এই ওরাল থ্রাশ নামক রোগের উল্লেখযোগ্য সমাধান। ছত্রাক দ্বারা সংঘটিত হয় মুখের এই রোগ। সাধারণত ক্যানডিডা আলবিক্যান্স নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে ওরাল থ্রাশ হয়। ওরাল থ্রাশ সচরাচর অক্ষতিকর ও ক্ষণস্থায়ী ছত্রাকঘটিত মুখবিবরের সংক্রমণ। এর সংক্রমণের ফলে মুখবিবরের জিহ্বা, ঠোঁট ও গালের অভ্যন্তরভাগ, তালু, আলজিহ্বা, টনসিল ও গলার ভিতরের অংশে ক্রিমের মত সাদা সাদা স্তুপ বা আস্তরণ জমা হয়। ক্রিমের মত স্তুপ বা আস্তরণ তুলে ফেলার পর লালচে ক্ষত সৃষ্টি হয়, আবার কখনো কখনো রক্তপাতও হতে পারে। বয়স্কদের বেলায় জ¦ালাপোড়া ভাব হয়। তবে ওরাল থ্রাশ নবজা...

টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ

  বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অসমতা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করা এবং শান্তি ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক জীবনে টেকসই ভবিষ্যত গঠনের লক্ষ্যে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত হয় টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি)। টেকসই ভবিষ্যত গঠনে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই এসডিজি বিশ্বব্যাপী  টেকসই ভবিষ্যত অর্জনের ব্লু প্রিন্ট নামে পরিচিত। যে ব্লুপ্রিন্ট বিশে^র দেশসমূহের কাছে মোট ১৭টি অভিষ্ট সমন্বিত একটি দলিল। ২০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে গৃহীত অভিষ্টগুলো অর্জনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। যা ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে কার্যকর হয়। অত্যন্ত গর্বের বিষয় হলো, মোট ১৭টি অভিষ্টের মধ্যে ১৫টি বাংলাদেশের সুপারিশকৃত প্রস্তাবের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। সঙ্গত কারণেই এসডিজি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এসডিজি’র সে গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষেত্র অনুযায়ী, দেশের এ পর্যন্ত অর্জনগুলো পর্যালোচনা করলে তা সহজেই প্রতিয়মান হয়। দেশে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে দারিদ্র্যের...