বর্তমান বৈশি^ক ব্যবস্থাপনায় গতিশীল নিয়ামকসমূহ একটি স্থবির বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যে কেন্দ্রটি করোনা ভাইরাস নামক এক প্রকার প্রাণঘাতী জীবাণু কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। বিশ^ব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় সহজেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে প্রাণঘাতী জীবাণুটি।
ফলশ্রæতিতে মানবগোষ্ঠী আজ এক কঠিন সময়ের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ভাইরাসটি আলোচনায় আসার পর ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর মাত্র দুটি প্রজাতি মানবদেহে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম ছিল। এমনকি ২০০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভাইরাসটি পৃথিবীতে তেমন আলোচনারও জন্ম দিতে পারেনি; কারণ এটি তখন উচ্চ শ^াসনালীতে সামান্য প্রদাহ সৃষ্টি করতে সক্ষম ছিল। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে সার্স করোনা ভাইরাস এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মার্স করোনা ভাইরাসে কিছু প্রাণহানির ঘটনার পর ভাইরাসটি গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি করে। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এসে কোভিড-১৯ রূপধারণকারী করোনা ভাইরাসটি এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক এবং দ্রæত সংক্রমণশীল ভাইরাসের একটিতে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় জানা যায়, ভাইরাসটি এ পর্যন্ত ৩৮৪ বার নিজস্ব জিনগত গঠন পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষণাগারে অল্প তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে জীবাণুটির অতিমাত্রায় বংশবৃদ্ধি থেকে অনেক গবেষক মনে করছেন বৈশি^ক পরিবেশ ও জলবায়ুগত বিভিন্ন পরিবর্তনের ফলে এই প্রাণঘাতী জীবাণুটি ধীরে ধীরে বর্তমান অবস্থায় পরিনত হয়েছে। আর এখন প্রতিনিয়তই জন্ম দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক রহস্য। গত নভেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে সংক্রমণ শুরু হলে চীনা বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটি করোনা ভাইরাসের একটি প্রজাতি উল্লেখ করে বলল, এটি উহানের বিখ্যাত সি ফুডের বাজার থেকে ছড়িয়েছে; সম্ভবত সামুদ্রিক কোনো প্রাণী অথবা বন্য কোনো পশু থেকে এর উৎপত্তি এবং এটি প্রতিরোধযোগ্য। বিজ্ঞানীরা অনিশ্চিত হয়ে বলল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। হালকা জ¦র, শুকনো কাশি, শ^াসকষ্ট জনিত সমস্যাকে রোগটির উপসর্গ উল্লেখ করে জীবন্ত পশুর অনিরাপদ সংস্পর্শ ও সর্দি-কাশিতে ভুগছে এমন লোকজনের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হল। বলা হল, কেউ আক্রান্ত হওয়ার ৫-৬ দিনের মাথায় উপসর্গ প্রকাশ পাবে আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময়টা ১৪ দিন পর্যন্তও হতে পারে। এ ধারণার উপর ভিত্তি করে কিছু সময় অতিবাহিত হল। পরে ভাইরাসটির দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং তাৎক্ষণিক অনেক রোগীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হিমশিম অবস্থা সৃষ্টির কারণে ২৩ জানুয়ারি চীনের ঐ প্রদেশটি লক-ডাউন করা হল; যাতে করে সংক্রমণের বিস্তার কমানো যায়। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরগুলোতে জ¦র, সর্দি-কাশি ইত্যাদি উপসর্গ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হল। ইতালিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাই করল।
এদিকে সিঙ্গাপুরে ভাইরাসটির প্রথম সংক্রমণ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্রæত সংক্রমণের বিস্তার খুঁজতে গিয়ে বের হল নতুন আর একটি তথ্য। সিঙ্গাপুরের গোয়েন্দারা তাদের দেশে সংক্রমণের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখল, ১৯ জানুয়ারী দ্য লাইফ চার্চ এন্ড মিশন নামের গির্জাটিতে প্রার্থনায় অংশ নেয়া চীনের উহান প্রদেশ থেকে আসা এক সুস্থ সবল দম্পতির মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। তারা যুক্তিসহ বিষয়টি উপস্থাপন করল। ঠিক একই ধরণের কথা বলল দক্ষিণ কোরিয়া। ১৬ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার সিডিসির পরিচালক জিয়ং ইউন কাইওং এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, “কোরিয়ায় এ মুহুর্তে লক্ষণ ছাড়া করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। হয়তো ব্যাপক ভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে।” পরবর্তীতে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল যে, ইয়াকোহামায় কয়েক সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে থাকা ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজের আরোহী ও ক্রু’সহ আক্রান্ত ৭১২ জনের মধ্যে ৩৩৪ জনের কোনো লক্ষণ ছিল না। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে প্রকাশ হওয়া চীনের গোপন নথিতে দেখা গেল ভাইরাসটিতে আক্রান্ত এমন ৪৩ হাজারের শরীরে কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। যা দেশটিতে আক্রান্ত প্রতি ৩ জনে ১ জনের মধ্যে এমনটা ঘটেছে। জরিপে দেখা যায়, ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পূর্বে সবচাইতে বেশি সংক্রামক হতে পারে। অর্থাৎ ভাইরাসটির প্রি-সিম্পটম্যাটিক ট্রান্সমিশন অত্যন্ত বেশি। এমনকি ৪৩ শতাংশের শরীরে জ¦রই আসে না। ততদিনে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্সসহ ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশে শিকড় গেছে বসেছে ভাইরাসটি। অন্যদিকে উপসর্গের তালিকায়ও যুক্ত হয়েছে ডায়রিয়া, কনজাংটিভাইটিস, মাথা-যন্ত্রণা, ত্বকের র্যাশ, হাত-পায়ের আঙ্গুল বিবর্ণ হওয়া, বুকে ব্যথা, তীব্র শ^াসকষ্ট ইত্যাদিসহ নতুন নতুন উপসর্গ। আবার একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড রোগীদের গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা ৮০ শতাংশ এবং স্বাদ নেয়ার ক্ষমতা ৬৯ শতাংশ কমে যায়। সবশেষে যুক্ত হয়েছে পুনরায় আক্রান্তের ঘটনা।
এখন বিষয় হল, যেহেতু উপসর্গ থাকলে অসুস্থ না থাকলে সুস্থ এটা বলা যাবে না সুতরাং কে আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত নয় তা শুধু উপসর্গ রয়েছে এমন কিছু সংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষার উপর জোর দিয়ে বের করা যাবে কি? যাবে না! দেশের সব মানুষকে পরীক্ষা করলে তা হয়তো বলা যাবে। কিন্তু একটি দেশের সব মানুষকে পরীক্ষার প্রক্রিয়াতে আনা কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব? সম্ভব নয়! আবার প্রথমবার আক্রান্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হবে না একথাও নিশ্চিত করে বলা যাবে না। একইসাথে বলা যায়, রোগটির চিকিৎসাতেও এখনো আসেনি আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি। প্রথমদিকে অ্যাজিথ্রোমাইসিন, হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, আইভারমেকটিনের কথা শোনা গেলেও এগুলোর কোনোটিই ভাইরাস প্রতিরোধী নয়। সম্প্রতি আমেরিকান ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিট্রেশন অনুমোদিত রেমডেসিভিরকে একমাত্র করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী বলে প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, যে সব রোগীর ক্ষেত্রে রেমডেসিভির ব্যবহার করা হয়েছে তারা ১১ দিনে আর যাদের ক্ষেত্রে এ ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি তারা সুস্থ হয়েছে ১৫ দিনে। ফলেই পরবর্তীতে ওষুধের চেয়ে গুরুত্ব পেল প্লাজমা থেরাপি। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে সকল রোগী প্লাজমা থেরাপিতে সুস্থ হয়েছেন তারা কী শুধু প্লাজমা থেরাপিতে সুস্থ হয়েছেন নাকি এ সময় প্লাজমা থেরাপির পাশাপাশি অন্যান্য ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে। উত্তর হল, সমন্বিত থেরাপিতেই সুস্থ হয়েছে। অর্থাৎ ট্রায়াল ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না; যা সময় সাপেক্ষ। তাই এখন বিভিন্ন দেশে একমাত্র ভরসা হিসেবে রোগটির ভ্যাকসিন তৈরির উপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। ভ্যাকসিন তৈরিই কী সমাধান? গবেষকদের মতে, একটি ভ্যাকসিন তৈরির পর নিরাপদ হতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ মাস সময় প্রয়োজন। তাহলে কী আমরা এই দীর্ঘ সময়টা অপেক্ষা করব? ভেবে দেখার বিষয়, দ্রæত সংক্রমণশীল করোনা ভাইরাস এ সময়ের মধ্যে কী করতে পারে। আবার চিন্তার বিষয়, বিশাল জনসংখ্যার পৃথিবীতে ভ্যাকসিন বিশ^ব্যাপী সহজপ্রাপ্য করা যাবে কিনা? ভাইরাসটির দ্রæত জিনগত পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর সব ভৌগোলিক পরিবেশে সমান কার্যকরী হবে কিনা? ইত্যাদি প্রশ্নগুলো সহজেই আসতে পারে। কিন্তু এটা ঠিক যে, অদূর ভবিষ্যতে ভ্যাকসিনই হবে একমাত্র সমাধান; না হলে পৃথিবী থেকে একে বিদায় করা যাবে না। সুতরাং প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটি প্রতিরোধে এ মুহুর্তে কী করণীয়? এখনও পর্যন্ত কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাকে একমাত্র সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছে বিশে^র দেশগুলো। ইতোমধ্যে ব্যাপকমাত্রায় আক্রান্ত দেশগুলো এর সুফলও পেয়েছে এবং নিউজিল্যান্ড দেশটি করোনা মুক্ত হিসেবে ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলা যায়, জনসচেতনতা ও সামাজিক দূরত¦ মেনে জীবনযাপন এর প্রতিরোধে অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু ভাইরাসটি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্যের জন্ম দিচ্ছে এবং তথ্যগুলো কতটা নিশ্চিত তা এখনও ব্যাপক গবেষণার বিষয়; আশু সমাধানও বের করা সম্ভব হচ্ছে না তদ্রæপ জনসচেনতার মাধ্যমে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত ছাড়া বিকল্প নেই। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র কর্তৃক এক্সিট প্ল্যান করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর লকডাউন-ই হতে পারে একমাত্র ব্যবস্থা।
মনে রাখতে হবে, ভাইরাসটি যত দ্রæত বিস্তার লাভ করতে সক্ষম বর্তমানে কঠোর লক-ডাউনের মাধ্যমে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো দেশের পক্ষে শুধু চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে এর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী দেশ ও অঞ্চলগুলো হতে পারে অনুপ্রেরণার উৎস।

Comments
Post a Comment